|
চর : ভূমির বৈশিষ্ট্য এবং চরের অধিবাসীগণ |
|
|
|
|
বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ না হলেও যমুনার উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে প্রায় ৩০ লক্ষ ৫০ হাজার লোকের বসবাস। এদের মধ্যে ১০ লক্ষ লোক নদী তীরবর্তী অথবা নদী বিধৌত দ্বীপে বা চরে বাস করে। নদী ভাঙন এবং পলি জমার কারণে এসব চরের সৃষ্টি হয়, যা সারা বছরই পানিবেষ্টিত থাকে। যমুনা অঞ্চলে সংঘটিত প্রায়-বৎসারান্তিক প্লাবন বা বন্যার ফলে এসব চরে বারবার ভাঙা-গড়ার খেলা চলে, ফলে সেগুলো নদী ভাঙন্তপ্রবণ অঞ্চল হয়ে পড়ে। এই বন্যার কারণে প্রতিবছরই হাজার হাজার পরিবার অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়, কারণ বন্যার পানি হয় তাদের বাড়িঘর প্লাবিত করে কিংবা তারা যে জমিতে বাস করে, তা ভেঙ্গে যায়। ধারণা করা হয় চরবাসী পরিবারগুলো এক প্রজন্মে সাধারণত পাঁচ থেকে সাতবার স্থানান্তরিত হয় এবং এদের মধ্যে দরিদ্রতর পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে সংখ্যাটি অস্বাভাবিক বেশি কারণ তারা যেখানে সরে যেতে বাধ্য হয় সেখানের জমির মান এবং অবস্থান অপেক্ষাকৃত খারাপ। গত ৩৫ বছর ধরে যমুনা নদী ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে এবং যাবার পথে একই সঙ্গে চর এবং চরের জীবন যেমন তৈরি করছে তেমনি ধ্বংসও করছে। এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখার জন্যে নীচে চরের ইন্টারএকটিভ মানচিত্র দেখুন। যমুনার অধিকাংশ চরগুলোতে লোকজন একই সঙ্গে বসবাস এবং চাষাবাদ করে এবং চরের জমি থেকে যে আয় হয়, তা অনেকের পক্ষেই খেয়ে পরে বাঁচার জন্যে মোটেই যথেষ্ট নয়। একটি চরের গড় স্থায়িত্ব ৪০ বছর হলেও, যমুনার চরগুলো নতুন বলে সেগুলো সাধারণত ১০ বছর স্থায়ী হয়। এই অস্থাীয়ত্বের কারণে চরবাসীদের জীবন অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাদের জীবিকা হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। যেহেতু তারাই বাংলাদেশের সবচাইতে দরিদ্র এবং খাদ্য-নিরাপত্তাহীন জনগোষ্ঠী, তাই তারাই সিএলপি-র কর্মকান্ডের প্রধান লক্ষ্য।
মঙ্গা: একটি মৌসুমী অভাব বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বৎসারান্তিক মৌসুমী আকালকে মঙ্গা বলে অভিহিত করা হয়। সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অভাব স্থায়ী হয়। আগে সারা বাংলাদেশ জুড়েই মঙ্গা হতো কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং স্থানান্তরিত হওয়ার সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়াতে তা এখন মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমঞ্চলে সীমিত হয়ে এসেছে। আমন ধানের বীজ বোনা এবং ধান কাটার মাঝখানে কৃষি সংক্রান্ত কাজ-কর্মের সুয়োগ কমে যাওয়ায় এই মঙ্গা দেখা দেয়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য খুব বেশি না থাকাতে চরের বাসিন্দাদের জন্যে অন্যান্য জীবিকার (আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক) সুযোগও খুব বেশি থাকে না। খরা বা বন্যার বছরে আমন শস্যের বিনাশ, এই মৌসুমী বেকারত্ব ও খাদ্য সঙ্কটের কাল দীর্ঘায়িত এবং তীব্র করে তোলে। হত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্যে কাজের সুযোগ হ্রাস এবং মঙ্গাকাল দীর্ঘ মেয়াদে হলে সম্পদ/ সম্পত্তি, আয় এবং সঞ্চয়ের ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পরিবারগুলো এবং তাদের খাদ্য গ্রহণ বজায় রাখতে কিছু কৌশল অবলম্বন করে। যেমন: তারা তাঁদের কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়, টাকা বা খাদ্য ধার করে, আগাম শ্রম বিক্রি করে অথবা কাজের জন্যে অন্য কোথাও চলে যায়। যদিও চর-জনগোষ্ঠী চায় না তাদের পরিবারের কোনো সদস্য অনাহারে থাকুক, কিন্তু মঙ্গার মতো দুর্যোগকালে সবাই যখন তাতে আক্রান্ত তখন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে সনাতন প্রচলিত গোষ্ঠীগত মোকাবেলা কৌশল বা নিরাপত্তা বলয়ের ওপর ভরসা করা সম্ভব হয় না। এই প্রেক্ষাপটে, ডিএফআইডি এবং বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মঙ্গার তীব্রতা দূর করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই লক্ষ্য পূরণে দিন্তমজুরী ভিত্তিক কাজ এবং নগদ অর্থ ভিত্তিক বিভিন্ন বৃত্তি সহ স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদী সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে সিএলপি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সিএলপি প্রবর্তিত এই কর্মসংস্থান এবং বৃত্তিপ্রদান কর্মকাণ্ড মঙ্গার তীব্রতা কমাতে যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে তা ২০০৭ সালে সিএলপি পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে প্রমাণিত হয়েছে। চরে বেঁচে থাকা: বিপন্ন চরবাসীর দৈনন্দিন কঠোর বাস্তবতার অভিজ্ঞতার সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত নমনীয়। প্রতিনিয়ত তাদেরকে টিকে থাকার চূড়ান্ত পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়; প্রাকৃতিক দূর্যোগ (বন্যা ও নদী ভাঙ্গন), ব্যয় সংকোচন, আর্থ-সামাজিক সঙ্কট (হ্রাসপ্রাপ্ত কর্মসংস্থান বা আয়ের সুযোগ এবং ক্রমহ্রাসমান নগদ মজুরি) ইত্যাদি মোকাবেলার করার মধ্যে দিয়ে। |